Thursday, January 30, 2020

কৃষি যন্ত্রপাতিতে বিপ্লব দেশীয় বাজার চাহিদা ১০ হাজার কোটি টাকা

রুহুল আমিন রাসেল

কৃষি যন্ত্রপাতিতে বিপ্লব
কেবল ফসল উৎপাদনেই নয়, কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ প্রযুক্তিতেও বিপ্লব করেছে বাংলাদেশ। এখন প্রতি বছর কৃষকের চাহিদা ১০ হাজার কোটি টাকার মেশিনারিজ। আছে রপ্তানি সম্ভাবনাও। তবে সরকারি সহায়তায় ঘাটতি দেখছেন উদ্যোক্তারা। তারা বলেছেন, চড়াসুদে ব্যাংক ঋণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন। জানা গেছে, কৃষি আধুনিকায়নের ফলে কম খরচেও উৎপাদন বেশি হচ্ছে। বাড়ছে আয়। দেশে এখন ৯০ শতাংশ কৃষি জমি তৈরির কাজ করছে ট্রাক্টর। ফলে ফসলের উৎপাদনও ১২ থেকে ৩৪ শতাংশ বেড়ে গেছে। বপন যন্ত্র ব্যবহারের ফলে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বীজ ও সার সাশ্রয় হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত কৃষি যন্ত্রপাতির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। স্থানীয়ভাবে তৈরি এসব কৃষি যন্ত্রপাতির চাহিদার বৃদ্ধির ফলে গড়ে ওঠেছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কৃষি যন্ত্র তৈরির কারখানা। দেশে কৃষি যন্ত্রাংশের উৎপাদন শুরু হয় আশির দশকে। ঢাকার জিনজিরা, ধোলাইখাল, টিপু সুলতান রোড, নারায়ণগঞ্জের ডেমরায় বিপুল পরিমাণে কৃষি যন্ত্র উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে বগুড়া, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রচুর পরিমাণে মানসম্মত যন্ত্রাংশ তৈরি হচ্ছে। তবে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ক্ষেত্রে বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও প্রয়োজনীয় সরকারি উদ্যোগ ও অবকাঠামো না থাকায় এই খাতের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ এগ্রিকালচার মেশিনারিজ মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি খন্দকার মনিউর রহমান জুয়েল বলেন, দেশীয় বাজারে প্রতি বছর ১০ হাজার কোটি টাকার কৃষি মেশিনারিজের চাহিদা রয়েছে। তবে কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরি ও রপ্তানিতে প্রচুর সম্ভাবনা থাকলেও, সরকারি সহায়তা নেই। তারপরও দেশে উন্নত মানের কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরি হচ্ছে। এমনকি চীনের চেয়েও উন্নত মানের মেশিনারিজ তৈরি করছে বাংলাদেশ। কিন্তু ক্রেতারা এখনো বিদেশি মেশিনের দিকে ঝুঁকছেন। বাংলাদেশ এগ্রো-প্রসেসর অ্যাসোসিয়েশন-বাপা’র শিল্প পরিদর্শন কমিটির চেয়ারম্যান ইশাকুল হোসেন সুইট বলেন, দেশে ধান উৎপাদন সাড়ে তিনগুণ বেড়েছে শুধু কৃষি আধুনিকায়নের ফলে। তবে কৃষির আরও আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিগত সরকারি সহায়তা প্রত্যাশা অনুযায়ী কম। এর সঙ্গে ব্যাংক ঋণের উচ্চসুদ ও উদ্যোক্তাদের ঋণ না পাওয়াটাও বড় চ্যালেঞ্জ। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের খামার যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের পরিচালক মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, দেশের কৃষি উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়েছে আধুনিক যন্ত্রাংশ ব্যবহারের জন্য। কৃষক ও উদ্যোক্তাদের সচেতন করতে আমরা বিভিন্ন এলাকায় মেলার আয়োজন করেছি। এই খাতে ভর্তুকির ফলে কৃষি উৎপাদনের চিত্র বদলে গেছে। এখন আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, রাজস্ব খাত থেকে সরাসরি কৃষকদের ভর্তুকি দেওয়া হবে যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ওপর। প্রকল্পটি খুব দ্রুত শুরু হবে। দেশের কৃষিকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর করা গেলে উৎপাদন ৩/৪ গুণ বাড়ানো সম্ভব। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের প্রফেসর ড. এ টি এম জিয়াউদ্দিন মতে, কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ফলে ফসলের উৎপাদন খরচ কমে যাওয়ার পাশাপাশি ফসলের নিবিড়তা ৫-২২ ভাগ বেড়ে যায়। এ ছাড়াও বীজ বপন যন্ত্রে বীজ বুনলে বীজ ২০ ভাগ সাশ্রয়ের পাশাপাশি সার ১৫-২০ সাশ্রয় হয়। অন্যদিকে ফসলের উৎপাদনও ১২-৩৪ ভাগ বৃদ্ধির সঙ্গে কৃষকের আয় বাড়ে ২৯-৪৯ ভাগ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের খামার যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের তথ্যমতে, কৃষি খাতে আধুনিক মেশিনারিজ প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর সরকার ৭০ ভাগ পর্যন্ত ভর্তুকি দিচ্ছে। দেশের কৃষি অর্থনীতিতে বিপ্লব এনে দিয়েছে সরকারের এই উদ্যোগ। গত কয়েক বছর ধরে কৃষি শ্রমিকের সংকট কমাতে ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। জমি চাষ থেকে ফসল মাড়াই-সব প্রক্রিয়ায় যুক্ত হচ্ছে আধুনিক কৃষি মেশিনারিজ প্রযুক্তি। জাপানের প্রযুক্তি নিয়ে এসেছে দেশীয় একাধিক বিপণন প্রতিষ্ঠান। দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষক ও উদ্যোক্তাদের কাছে নিয়ে গেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। ২০১০ সালে প্রথম কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প হয়। তখন আধুনিক যন্ত্রাংশ ব্যবহারের ওপর ২৫ শতাংশ হারে ভর্তুকি দেওয়া হয়। সর্বশেষ ২০১৭ সালে দক্ষিণ এলাকা ও হাওর অঞ্চলে ৭০ শতাংশ ও অন্যান্য এলাকায় ৬০ ভাগ হারে ভর্তুকি দিচ্ছে। সরকারের এই প্রকল্পের কারণে ভাগ্য বদলে গেছে হাজার হাজার কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তার। বর্তমানে এই খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে রিপার মেশিন, কম্বাইন্ড হারভেস্টার, ট্রেইলার, রোটারি ট্রেইলার, লন মোয়ার, আয়রন হুইল, ডাবল পিলো, ফ্লিপ পিলো, স্পিডারসহ নতুন সব প্রযুক্তি মেশিনারিজ। ডাল গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক প্রকৌশলী মো. শোয়েব হাসান বলেন, ভর্তুকি মূল্যে কৃষকদের মাঝে কৃষি যন্ত্রপাতি বিতরণের সুফল মিলেছে। এখন প্রয়োজন কৃষকদের প্রশিক্ষণ, উদ্বুদ্ধকরণ ও কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার বাড়ানো। সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষি যান্ত্রিকীকরণে চাষের পর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় বীজ বপন, গুটি ইউরিয়া সার প্রয়োগ, শস্য কর্তন, শস্য মাড়াই, শস্য ঝাড়াইসহ অন্যান্য কার্যাবলিতে কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার। ফলে কৃষক দিন দিন কৃষিযন্ত্রের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে। একটা ফসল লাগানোর মধ্যবর্তী সময় কমে যাওয়ায় কৃষকরা বছরে এখন দুটি ফসলের স্থানে তিনটি ফসল করতে পারছে।
 বাংলাদেশ প্রতদিন।

Friday, January 10, 2020

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা

বাংলাদেশ প্রতিদিন
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা

ব্লু ইকোনমি হচ্ছে সমুদ্রসম্পদনির্ভর অর্থনীতি। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে রয়েছে এই ব্ল -ইকোনমির অপার সম্ভাবনা। বহু বছর ধরে এ অঞ্চলের মানুষ সমুদ্র ও উপকূলবর্তী মোহনা থেকে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের নানা কৌশলে অভ্যস্ত।
গবেষকদের মতে, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সক্ষমতা বাড়ানো গেলে সাগরের বিশাল জলরাশি ও এর তলদেশের সম্পদ কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হবে। এরই মধ্যে প্রাথমিক অনুসন্ধানে বঙ্গোপসাগরের তিনটি বৃহৎ মৎস্য আহরণ অঞ্চলের সন্ধান মিলেছে। জানা যায়, টেকসই ব্লু ইকোনমিবিষয়ক গবেষণায় এরই মধ্যে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইএমআরএডি) ও খুলনা        বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর আওতায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সমুদ্রবিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণা, সামুদ্রিক সম্পদ অনুসন্ধান, আহরণসহ আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করবে। এদিকে ২৪ ডিসেম্বর খুলনায় এ-বিষয়ক সেমিনারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির আহ্বান জানানো হয়। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এওসেডের নির্বাহী পরিচালক শামিম আরফিন বলেন, ‘দেশের ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটার সমুদ্রসীমাকে ঘিরে নতুন স্বপ্ন দেখছেন গবেষক ও অর্থনীতিবিদরা। গভীর সমুদ্রে রয়েছে মৎস্য আহরণের বিপুল সম্ভাবনা। সেইসঙ্গে সামুদ্রিক উদ্ভিদ ও প্রাণী-শৈবাল, তেল-গ্যাস-খনিজ পদার্থের অনুসন্ধান, জাহাজ নির্মাণ শিল্প, সামুদ্রিক নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার ও সমুদ্রতীরবর্তী পর্যটন কেন্দ্রের মাধ্যমে অর্থনীতি বহুমাত্রিকতা পাবে।’
তিনি বলেন, ‘বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণাঞ্চলের ৬ হাজার ২০০ বর্গ কিলোমিটার, সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের ৩ হাজার ৮০০ বর্গ কিলোমিটার ও দক্ষিণের দক্ষিণ মৎস্য ক্ষেত্রে প্রায় ২ হাজার ৫৩৮ কিলোমিটার এলাকায় বিদেশে রপ্তানিযোগ্য দামি মাছ পাওয়া যাবে।’ তবে এর সুফল পেতে আরও গবেষণা, কার্যকর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কৌশল প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন গবেষকরা। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্টি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, ‘টেকসই ব্লু ইকোনমির ব্যবহার, ব্যবস্থাপনা ও বিকাশে বড় ধরনের গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের কী পরিমাণ সামুদ্রিক সম্পদ রয়েছে তা গবেষণা ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে জানা প্রয়োজন। বিমরাডের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকের আওতায় কিছু প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে; যার মাধ্যমে সমুদ্রবিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণা, সমুদ্রসম্পদ অনুসন্ধান, আহরণসহ আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করা যাবে।’ এদিকে ব্লু ইকোনমির মাধ্যমে বিশাল কর্মসংস্থানের সম্ভাবনারও কথা বলেছেন বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির মহাসচিব শেখ আশরাফ-উজ্জামান। তিনি বিশাল এ কর্মযজ্ঞে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, কার্যকর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কৌশল প্রণয়নের দাবি জানান।