Friday, February 21, 2020

মেড ইন বাংলাদেশ’ স্মার্টফোন বিপ্লব

 
ডিজিটালাইজেশন যাত্রায় সদ্য পেরিয়ে আসা দশকটাকে বহুকাল পরেও বাংলাদেশের মানুষকে মনে রাখতে হবে কয়েকটি কারণে।
একটি হলো এই শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে বাংলাদেশ স্মার্ট ডিভাইস তৈরির কাজে হাত দিয়েছিলো। আর মাত্র দুই আড়াই বছরের মধ্যে ’মেড ইন বাংলাদেশ’কে একেবারে প্রতিষ্ঠিত করে ছেড়েছে মাত্র কয়েকজন উদ্যোক্তা।
অথচ বছর কয়েক আগেও কি কেউ চিন্তা করেছিলেন বাংলাদেশের কোনো কারখানায় বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির মোবাইল ফোন সংযোজিত হবে? আবার সেটির দাম এবং মানও হবে আমদানিকৃত ডিভাইসের চেয়ে সেরা!
কল্পনার বাইরে থেকে সেই স্বপ্নকে বাস্তবতা দিয়ে এখন বেশ কয়েকটি কোম্পানি দাঁড়িয়ে গেছে যারা আর কোনো ডিভাইস-ই আমদানি করছে না। কী বেসিক ফোন বা সর্বাধুনিক ক্ষমতার স্মার্টফোন সবাই তৈরি করছেন ঢাকা, গাজীপুর বা নরসিংদীর কারখানায়।
কেউ কেউ আছেন এখন শুধু স্মার্টফোন তৈরি করছেন আর প্রক্রিয়ার মধ্যে আছেন যাতে তাদের সমস্ত চাহিদাই দেশীয় কারখানা থেকে মেটাতে পারেন।
২০১৭ সালের অক্টোবরে ওয়াল্টন দিয়ে শুরু হয়েছিলো। একে একে এখানে নয়টি কারখানা হয়ে গেছে। তালিকায় আছে স্যামসাংয়ের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড। আছে বিভিন্ন অঞ্চলে জনপ্রিয়তা পাওয়া চাইনিজ ব্র্যান্ড আইটেল এবং টেকনো। দেশীয় ব্র্যান্ড সিম্ফোনিও কম যায় না।
গত বছরই কারখানা করে ফেলেছে দুটি জনপ্রিয় চাইনিজ ব্র্যান্ড ভিভো এবং ওপ্পো। দেশীয় ফাইভ স্টার ব্র্যান্ড যেমন নিজেদের কারখানা করে সফলতা পেয়েছে তেমনি উনম্যাক্সও বেশ ভালো করেছে। অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছে হুয়াওয়ে বা মটোরোলার মতো ব্র্যান্ডও।
একটা সময় ছিলো, যখন ভালোমানের মোবাইল ফোনের জন্য ক্রেতারা ‘মেইড ইন ফিনল্যান্ড’ বা ‘মেইড ইন কোরিয়া’ খুঁজতেন। এরপর সেই জায়গাটি নিয়ে নেয় ‘মেইড ইন চায়না’ এরপরে আসে ‘মেইড ইন ভিয়েতনাম’। এখন এই ট্যাগ লাইনে জ্বলজ্বলে নাম ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’।
প্রথমদিকে ক্রেতাদের মধ্যে এক ধরণের জড়তা ছিলো। কিন্তু, এর সবই কেটে গেছে এখন। হ্যান্ডসেটে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডিং বলতে মিডিয়াতে কিছু রিপোর্ট। এর বাইরে বলতে গেলে হ্যান্ডসেটগুলোর ব্যবহারকারীরাই এর মানের কথা লোকমুখে প্রচার করেছে বেশি। আর তাতেই আসল কাজটা হয়ে গেছে।
বলতে গেলে মাত্র দুই বছরেই বাংলাদেশ স্মার্টফোন উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে।
২০১৯ সালে দেশে যতো স্মার্টফোন বিক্রি হয়েছে তার ৬২ শতাংশ উৎপাদিত হয়েছে বাংলাদেশে স্থাপিত কোনো না কোনো কারখানা থেকে। আর চলতি বছরের মধ্যে বাজারে স্মার্টফোনের চাহিদা দেশীয় কারখানা থেকেই সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলেও বলছেন স্থানীয় মোবাইল কারখানার মালিকরা। নিশ্চিতভাবে এ আমাদের জন্যে বড়ই সুখের সংবাদ।
গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে বছরে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লাখ পিস স্মার্টফোন বিক্রি হয় দেশে। এর মধ্যে গত বছর দেশের বিভিন্ন কারখানায় সব মিলে ৫৪ লাখ স্মার্টফোন সংযোজিত হয়েছে। আরও প্রায় ২৪ লাখের মতো স্মার্টফোন হয় বৈধ পথে আমদানি হয়েছে নয়তো অবৈধভাবে দেশে ঢুকেছে। ২০২০ সালে এর পুরোটাই দেশে উৎপাদিত হতে যাচ্ছে বলে তাদের বিশ্বাস।
এই খাতটির সঙ্গে কাজ করা একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে খুব কাছ থেকে দেখছি খাতটির জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। সেই হিসেবে তাদের বিশ্বাস এবং প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থা রাখতে চাই।
যেভাবে স্যামসাং প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো ২০২০ সালের প্রথম প্রান্তিকেই তাদের সর্বোৎকৃষ্ট প্রযুক্তিসম্পন্ন স্মার্টফোন সিরিজ ‘নোট’ দেশের কারখানায় সংযোজন করবে, সে কথা তারা রেখেছে। এটি এখন গোটা বাংলাদেশকে গর্ব করার খবর। বিদেশি গণমাধ্যমেও প্রচারিত হয়েছে এই খবর।
স্যামসাং এখন তাদের স্থানীয় চাহিদার ৯৭ শতাংশই নরসিংদীর কারখানায় উৎপাদন করছে।
যাত্রার মাত্র এক বছরের মধ্যে দুটি ব্র্যান্ড – টেকনো এবং আইটেল – এর চাহিদার পুরোটাই নিজেদের কারখানায় সংযোজন করে সাড়া ফেলেছে। ওয়াল্টনও দুই বছর হয়ে যাচ্ছে আর কোনো সেট আমদানি করছে না। এই খবরগুলো আমাদেরকে গর্বিত করছে।
কিন্তু, যখন পেছন ফিরে কেউ জানবেন যে, ২০০৭ সালে স্যামসাং আগ্রহ প্রকাশ করেছিলো বাংলাদেশে একটি কারখানা করতে। কিন্তু, নানা কারণে সেটি তারা করতে না পেরে চলে গেছে ভিয়েতনামে। এরপর ভিয়েতনামে একে একে তারা তিনটি কারখানা করেছে। গত বছর পর্যন্ত বছরে ১৪ কোটির কাছাকাছি স্মার্টফোন তৈরি হয়েছে স্যামসাংয়ের ওই কারখানাগুলো থেকে।
আর চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধ যখন শুরু হলো তখন তো ভিয়েতনাম পেয়ে গেলো আরও গতি। এখন গোটা বিশ্বে স্যামসাংয়ের যে চাহিদা তার অর্ধেকটার বেশি জোগান দেওয়া হচ্ছে এই দেশটি থেকে।
সুখের ঢেকুর তোলার বিপরীতে এটিই হতে পারে আমাদের জন্যে দীর্ঘশ্বাস ছাড়া এক হতাশা।
এখানে যে জিনিসটা বলতে চাই, হয়তো এক যুগ আগের সেই ট্রেন আমরা মিস করেছি কিন্তু, যে ট্রেনটি শেষ পর্যন্ত আমরা ধরতে পারলাম সেটির গতি কীভাবে আরও বাড়ানো যায় সেদিকেও তাকাতে হবে আমাদের।
প্রথম কাজ গত বাজেটেই করা হয়েছে, স্মার্টফোনের আমদানি কর বাড়িয়ে ৫৭ শতাংশ করে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং কারখানা স্থাপনে সবাই-ই বেশ গতি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। এখন যদি মানের দিকে একটু নজর দেওয়া হয় তাহলে সেটি আরও কাজের হবে নিশ্চয়ই।
আমরা জেনেছি ইতিমধ্যে কোনো কোনো উদ্যোক্তা মোবাইল সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় অ্যাক্সেসরিজ তৈরির জন্যেও কারখানা তৈরির কাজে হাত দিচ্ছেন। সেক্ষেত্রে ব্যাটারি-ফোনের কেসিং-চার্জারসহ নানা ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের চাহিদা দেশীয় কারখানা থেকেই আসতে পারে।
কে বলতে পারে বাংলাদেশের রপ্তানি যেভাবে গার্মেন্টসের ওপর দাঁড়িয়ে গেছে একসময় সেখানে যে মোবাইল হ্যান্ডসেটও বড় ভূমিকা রাখবে না?
নিজ নিজ কারখানা থেকে রপ্তানির কথা বলছেন সবাই-ই। সবাই না পারুন অন্তত কয়েকজনও যদি দু-এক বছরের মধ্যে কাজটা শুরু করতে পারেন, হয়তো দিন বদলে হাতিয়ার এই মোবাইল ডিভাইস ইন্ড্রাস্ট্রি হয়ে যেতে পারে।
শুধু মোবাইল ডিভাইস কেন, ল্যাপটপেও আমরা দেখছি ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ। একটু-আধটু করে হলেও রপ্তানির তালিকায় যুক্ত হচ্ছে এই ডিজিটাল ডিভাইসটিও।
আমরা এখন সেই দিনেরই অপেক্ষায় আছি যেদিন ইউরোপ-আমেরিকায় ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লেখা শার্ট বা ডেনিমের মতো করে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লেখা মোবাইল ডিভাইসও মিলবে।

ডেইলী স্টার

Tuesday, February 18, 2020

মেইড ইন বাংলাদেশ স্মার্টফোন যাচ্ছে আমেরিকা

মেইড ইন বাংলাদেশ স্মার্টফোন যাচ্ছে  আমেরিকা
দেশের রফতানি খাতে সৃষ্টি হতে যাচ্ছে নতুন এক মাইলফলক। এই প্রথম ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগযুক্ত স্মার্টফোন আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
দেশের শীর্ষ ব্র্যান্ড ওয়ালটনের তৈরি স্মার্টফোন যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। জানা গেছে, আমেরিকার একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ওয়ালটনের কাছ থেকে স্মার্টফোন নিচ্ছে।
ওরিজিনাল ইক্যুইপমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার (ওইএম) হিসেবে ওই ব্র্যান্ডটিকে স্মার্টফোন তৈরি করে দিচ্ছে ওয়ালটন। ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগযুক্ত ওয়ালটনের তৈরি স্মার্টফোনগুলো আমেরিকার বাজারে বিক্রি হবে।
১ মার্চ অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গাজীপুরের চন্দ্রায় ওয়ালটন ডিজি-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে আমেরিকায় স্মার্টফোন রফতানি কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন। এ সময় আরও উপস্থিত থাকবেন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।
উল্লেখ্য, এর আগে আমেরিকার বাজারে ইলেকট্রনিক্স এবং আইসিটি পণ্য বিক্রির জন্য বিশ্বখ্যাত ই-কমার্স জায়ান্ট অ্যামাজনের সঙ্গে চুক্তি করে ওয়ালটন।

Wednesday, February 12, 2020

পোড়াদহ মাছের মেলা

ফাগুনের প্রস্তুতি ৩৫ কোটি টাকার ফুলের বাজার ধরতে ব্যস্ত গদখালি ও শার্শার চাষিরা

৩৫ কোটি টাকার ফুলের বাজার ধরতে ব্যস্ত গদখালি ও শার্শার চাষিরা
দরজায় কড়া নাড়ছে বসন্ত। আর কদিন পরই বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আর এ দিবসগুলোর ফুলের  বাজার ধরতে ব্যস্ত সময় পার করছেন ফুলের রাজ্য খ্যাত যশোরের গদখালি ও শার্শা এলাকার ফুলচাষিরা। ফুল ব্যবসায়ীদের      কাছে পুরো ফেব্রুয়ারি মাসটি উৎসবের মাস হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। দুই বছর আগের বসন্ত বরণ ও বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে প্রিয়জনের মন রাঙ্গাতে গদখালীর ফুলচাষিরা নতুন উপহার হিসেবে এনেছিলেন ‘লং স্টিক রোজ’। ভারতের পুনে থেকে চারা এনে ৪০ শতক জমিতে দেশে প্রথমবারের মতো বিশেষ ধরনের গোলাপের জাতটির চাষ শুরু করেছিলেন যশোরের গদখালীর ইনামুল হোসেন। অন্য জাতের গোলাপ ফুল গাছ থেকে তোলার পর যেখানে ৪-৫ দিনের বেশি রাখা যায় না, সেখানে লং স্টিক গোলাপ রাখা যায় দুই সপ্তাহ পর্যন্ত। এর স্টিক বেশ শক্ত। দামও মিলছে দ্বিগুণ। এসব কারণে ইনামুলের দেখাদেখি এ অঞ্চলের বেশিরভাগ চাষির মাঠে শোভা পাচ্ছে গোলাপের নতুন এই জাত। তবে এবার নতুন জাতের ফুল উপহার দিতে না পারলেও এখানকার চাষিরা ফুল প্রেমীদের দিচ্ছেন চমকপ্রদ খবর। টিস্যু কালচারের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত জারবেরা চারায় ফুল ফোটাতে যাচ্ছেন তারা। এ গাছে আগামী বাংলা নববর্ষের আগেই ফুল ফুটবে বলে আশা করছেন চাষিরা। এতদিন বেঙ্গালুর থেকে চারা এনে জারবেরা চাষ করতেন চাষিরা। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আরআরএফ যশোরের টিস্যু কালচার সেন্টার জারবেরার চারা তৈরি করছে। বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির তথ্যমতে, এবার যশোরে পাইকারি পর্যায়ে প্রায় ৩৫ কোটি টাকার ফুল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যশোরে প্রায় ৬ হাজার ফুলচাষি ৬৪০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন প্রকার ফুল চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এখানে বেশি চাষ হয় গ্যালোরিয়াস, রজনীগন্ধা ও গোলাপ। তাদের উৎপাদিত জারবেরা, গাঁদা, জিপসি, রডস্টিক, কেলেনডোলা, চন্দ্র মল্লিকাসহ ১১ ধরনের ফুল সারা দেশের মানুষের মন রাঙ্গাচ্ছে। সরেজমিন যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালি, পানিসারা, নাভারণ, নির্বাসখোলা শার্শার উলাশী এলাকার মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, ‘লং স্টিক রোজে’র পাশাপাশি বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন দোল খাচ্ছে জারবেরা, গোলাপ, গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা, হলুদ গাঁদা ও চন্দ্রমল্লিকাসহ হরেক রকমের ফুল। বাতাসে ফুটন্ত ফুলের সুবাস ছড়িয়ে যাচ্ছে চারদিকে। ফলন ও দাম ভালো হওয়ায় ফুলের হাসি লেগেছে চাষিদের চোখেমুখেও। দেশে ফুলের মোট চাহিদার ৭০ ভাগই যশোরের গদখালী ও শার্শা থেকে সরবরাহ করা হয়। বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে ৩০ লাখ মানুষের জীবিকা এই চাষ বা ফুলকে কেন্দ্র করে। প্রায় ২০ হাজার কৃষক ফুলচাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে কেবল যশোরেই প্রায় ৭ হাজার ফুলচাষি রয়েছেন। যশোর আঞ্চলিক কৃষি অফিসের উপ-পরিচালক এমদাদ হোসেন জানান, এবার জেলায় ৬৪০ হেক্টর জমিতে ফুলের আবাদ করা হয়েছে। দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৬০ ভাগের বেশি যশোরের গদখালী ও শার্শা থেকে সরবরাহ করা হয়। দেশের গন্ডি পেরিয়ে ফুল এখন যাচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়ায়।

জেলাটির ২শ হেক্টরে শুধুই ফুল

জেলাটির ২শ হেক্টরে শুধুই ফুল


ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা এখন দেশের ফুলের দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে যাচ্ছে। ফুলের রাজধানীখ্যাত যশোরের গদখালীর পরেই স্থান করে নিয়েছে কালীগঞ্জ। যশোর ও ঝিনাইদহ থেকে সারাদেশে যায় হরেক রকমের ফুল। দেশে ফুলের অর্ধেক চাহিদা পূরণ হয় এই দুুটি জেলা থেকে আসা ফুলে।  এবারের বিশ্ব ভালবাসা দিবস, পহেলা ফাল্গুন ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের ফুলচাষিরা দেড় থেকে দুই কোটি টাকার ফুল বিক্রির টার্গেট নিয়েছেন। বর্তমানে তারা ক্ষেতের ফুলের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। 
ঝিনাইদহ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলার ৬ উপজেলায় ২শ ৮ হেক্টর জমিতে বিদেশী ফুল লিলিয়াম, জারবেরা, চন্দ্রমল্লিকা,  গোলাপ, থাইগোলাপ, গ্লাডিওলাসসহ বিভিন্ন রকমের ফুলের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু কালীগঞ্জ উপজেলার ফুলের আবাদ হয়েছে ১শ হেক্টর জমিতে। কালীগঞ্জে চাষ হওয়া ফুলের মধ্যে রয়েছে লিলিয়াম, জারবেরা, গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা,  গোলাপ, চন্দ্রমল্লিকা, ভুট্টাফুল, গাঁদাফুল, থাই গোলাপসহ বিভিন্ন রকমের ফুল। 
ঝিনাইদহ জেলার সবচেয়ে বড় ফুলচাষী কালীগঞ্জ উপজেলার ত্রিলোচনপুর গ্রামের এস এম টিপু সুলতান জানান, দক্ষিণাঞ্চলের হন্ডিতে টাকা লগ্নি করে যখন এ অঞ্চলের মানুষ দেউলিয়া হয়ে পড়ে সে সময় থেকেই তিনি ফুল চাষের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি প্রথম ফুল চাষ শুরু করেন বলে দাবি করেন। 
তিনি শেরে বাংলানগর ফুলচাষী ও ফুল ব্যবসায়ী সমিতি লিমিটেডের সহ-সভাপতি। ঢাকায় তার ফুলের ব্যবসাও রয়েছে। তিনি কালীগঞ্জ উপজেলার ত্রিলোচনপুরের মাঠে মোট ১৫ বিঘা জমিতে ফুলের আবাদ করেছেন। এর মধ্যে ২ বিঘা জমিতে গোলাপ, ৬ বিঘায় জারবেরা, ২ বিঘায় গ্লাডিওলাস, ৩ বিঘায় ভুট্টা ফুল ও ২ বিঘাতে চন্দ্রমল্লিকা ফুল রয়েছে। পাশাপাশি তিনি ২ বিঘা জমিতে পেয়ারা, ২ বিঘা ৫ কাঠা জমিতে ড্রাগনফল ও ৩ কাঠা জমিতে স্ট্রবেরি চাষ করেছেন বলে জানান তিনি। 
টিপু সুলতান আরও জানান, তিনি ২৭ বছর ধরে ফুলের সঙ্গে জড়িত। সর্বপ্রথম গ্লাডিওলাস দিয়ে ফুলের চাষ শুরু করেন। এরপর জারবেরা ফুলের আবাদ করেন। সর্বশেষ ২০১৭ সালে লিলিয়ামের চাষ করেন। নেদারল্যান্ডস থেকে ৬০ হাজার পিস লিলিয়াম ফুলের বীজ আনেন। গত দুই বছর ধরে তিনি লিলিয়াম ফুল বিক্রি করছেন। তার ফুলের পরিচর্যায় রয়েছে ৪ জন স্থায়ী কর্মী। এছাড়া প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ জন ব্যক্তি পরিচর্যার জন্য কাজ করেন। স্থায়ী ৪ জনকে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেতন দেওয়া হয়। অন্যদের দৈনিক জনপ্রতি ২শ টাকা করে মজুরি দেন। ফুলের পরিচর্যা, সেচ, সার, ওষুধ, পরিবহনসহ তার প্রতিবছরে ব্যয় হয় ২৪  থেকে ২৫ লাখ টাকা। বছরে তিনি অর্ধ কোটি টাকার ফুল বিক্রি করেন বলেও জানান। ব্যয় বাদে বছরে তার লাভ থাকে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা। 
এ ব্যবসায়ী আরও জানান, ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত ফুলের ব্যবসা ভাল হয়। এ সময় ফুলের দাম ভাল পাওয়া যায়। তিনি পাইকারী হারে ১টি লিলিয়াম ফুল ১০০ টাকা, জারবেরা ১২ থেকে ১৮ টাকা, গ্লাডিওলাস ১২ থেকে ১৯ টাকা, গোলাপ ৫ থেকে ১০ টাকা, চন্দ্রমল্লিকা ১ থেকে ৩ টাকা, ভুট্টা ফুল ৩ থেকে ৭ টাকা করে বিক্রি করে থাকেন। অবশ্য বাজার ভাল হলে দাম বেশি পাওয়া যায়। সে সময় প্রতিটি ফুলের দামও বৃদ্ধি পায়। আসছে বিশ্ব ভালবাসা দিবস, পহেলা ফাল্গুন ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে তিনি ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার ফুল বিক্রি করতে পারবেন। 
তার দাবি, চলতি বছরে ঝিনাইদহ জেলা থেকে ওই তিনটি দিবসে দুই থেকে আড়াই  কোটি টাকার ফুল বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আরও জানান, চীন থেকে প্লাস্টিকের ফুল আমদানি বন্ধ হলে ফুলচাষিরা আরও বেশি লাভাবান হবেন। 
একই এলাকার জিল্লুর রহমান, নয়ন মিয়াসহ কয়েকজন ফুলচাষি জানান, তারাও এই তিনটি দিবসে কয়েক লাখ টাকার ফুল বিক্রি করতে পারবেন। যশোর রাজার হাট এলাকা থেকে ফুলের চাষ করতে আসা মাহাবুর হোসেন জানান, তিনি দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলেন। সেখান থেকে এসে ৩ বিঘা জমিতে জারবেরা চাষ করেছেন। 
কালীগঞ্জ উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের ডুমুরতলা গ্রামের ফুলচাষি মিজানুর রহমান জানান, তিনি গাঁদা ফুলের চাষ করেন। চলতি বছর তিনি ৫ কাঠা, একই এলাকার মোহাম্মদ আলী ও এমদাদুল হক দুই ভাই ৮ কাঠা, আব্দুল আলীম ৫ কাঠা জমিতে ফুলের আবাদ করেছেন। 
তিনি আরও জানান, দড়িতে ফুল গেঁথে ঝোপা  তৈরি করা হয়। এক ঝোপায় সাড়ে ৬শ থেকে ৭শ গাঁদা ফুল থাকে। ফুলের মূল্য কম থাকলে এক ঝোপা বিক্রি হয় ৩০ টাকায়। দাম বাড়লে সর্বোচ্চ ৭শ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। বর্তমান ৩শ ৫০ থেকে ৪শ ৫০ টাকা দরে প্রতি ঝোপা ফুল বিক্রি হচ্ছে।
ঝিনাইদহ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃপাংশু শেখর বিশ্বাস জানান, জেলার চলতি বছর প্রায় ২শ ৮ হেক্টর জমিতে ফুলের আবাদ হয়েছে। উৎপাদন ব্যয় কম, আবার লাভ বেশি হওয়ায় কৃষকরা ফুল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। জেলার গান্না ও কালীগঞ্জের বালিয়াডাঙ্গা, তিল্লা, সিমলা, রোকনপুর,  গোবরডাঙ্গা, পাতবিলা, পাইকপাড়া, তেলকূপ, গুটিয়ানী, কামালহাট, বিনোদপুর,  দৌলতপুর, রাড়িপাড়া, মঙ্গলপৈতা, মনোহরপুর, ষাটবাড়িয়া, বেথুলী, রাখালগাছি, রঘুনাথপুর কোলাবাজারসহ জেলার বিভিন্ন গ্রামের মাঠে ফুল চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গাঁদা ফুল চাষ হয় কালীগঞ্জে বালিয়াডাঙ্গা এলাকায়। এ কারণে সবাই এখন এই এলাকাকে ফুলনগরী বলেই চেনে। 
সরেজমিনে বালিয়াডাঙ্গা বাজার ও কালীগঞ্জের মেইন বাসস্ট্যান্ডে দেখা যায়, দুপুর থেকে কৃষকেরা ক্ষেতের উৎপাদিত ফুল ভ্যান, স্কুটার ও ইঞ্জিনচালিত বিভিন্ন পরিবহন যোগে নিয়ে আসছেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বালিয়াডাঙ্গা বাজার ও কালীগঞ্জ মেইন বাসস্ট্যান্ড ভরে যায় লাল, সাদা আর হলুদ ফুলে। সারাদেশের আড়তগুলোতে ফুল পাঠাতে আসা একাধিক ফুলচাষির সঙ্গে আলাপ করে জানা  গেছে, সারা বছরই তারা ফুল বিক্রি করে থাকেন। তবে প্রতিবছর বাংলা ও ইংরেজি নববর্ষ, স্বাধীনতা দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ভালবাসা দিবস, পহেলা ফাল্গুনসহ বিভিন্ন দিনগুলোতে ফুলের অতিরিক্ত চাহিদা থাকে। এ সময় দামও থাকে ভালো। 
ফুলচাষিরা সারা বছর তাদের ক্ষেতের ফুল চুক্তি মোতাবেক ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বড় বড় শহরের ফুলের আড়তে পাঠিয়ে দেন। এ সব স্থানের আড়তদারেরা বিক্রির পর তাদের কমিশন রেখে বাকি টাকা পাঠিয়ে দেন। ফলে ফুল চাষিদের টাকা খরচ করে ফুল বিক্রির জন্য কোথাও যেতে হয় না। তারা মোবাইল বা ফোনালাপের মাধ্যমে বাজার দর ঠিকঠাক করে ফুল পাঠিয়ে থাকেন বলেও জানান কৃষকরা। 
এদিকে ফুলের আবাদকে কেন্দ্র করে কালীগঞ্জ উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা বাজারে গড়ে উঠেছে ফুলের জন্য আলাদা বাজার। ফুলচাষিরা সরাসরি এ বাজারে ফুল বিক্রি করতে আসেন। ফুলচাষিদের কাছ থেকে সরাসরি ফুল ক্রয় করেন এ বাজারের শুকুর আলী, ইউসুফ আলী, প্রদীপ বাবু, শামীম, ফজলুর রহমানসহ একাধিক ফুল ব্যবসায়ী। 
বালিয়াডাঙ্গা গোপীনাথপুর গ্রামের ফুল ব্যবসায়ী শুকুর আলী জানান, তিনি ফুলচাষিদের কাছ থেকে সরাসরি গাঁদা ফুল ক্রয় করেন। বর্তমানে এক ঝোপা হলুদ গাঁদা ফুল ৩শ ৫০ থেকে ৪শ ৫০ টাকা ও এক ঝোপা লাল গাঁদা ফুল ৫শ টাকা দরে ক্রয় করছেন। 
তিনি জানান, কালীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার আবাদ করা ফুল যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, খুলনা, বরিশাল, সিরাজগঞ্জ, সৈয়দপুর, রংপুর, নওগাঁ, ফরিদপুর, কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন  জেলায়। 
কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ জাহিদুল করিম বলেন, ঝিনাইদহ জেলার মধ্যে কালীগঞ্জ উপজেলাতেই ফুলচাষ সবচেয়ে বেশি। চলতি বছর কালীগঞ্জ উপজেলাতে ১শ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের ফুল চাষ হচ্ছে। এ ফুল চাষের সঙ্গে প্রায় ৭শ থেকে ৮শ ফুলচাষি জড়িত। এখানে বিদেশি ফুল লিলিয়াম, জারবেরা, গ্লাডিওলাসসহ গোলাপ, গাঁদা, রজনীগন্ধা, ভুট্টাফুলের চাষ হচ্ছে। আমরা কৃষি বিভাগ থেকে ফুলচাষিদের সার্বিকভাবে সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়ে আসছি।
বিডি প্রতিদিন/আল আমীন

Friday, February 7, 2020

গয়নার জনপদ ভাকুর্তা: ঐতিহ্য আঁকড়ে কষ্টের জীবন






ভাকুর্তায় তৈরি গয়না ঢাকা ও ঢাকার বাইরে পাইকারি দামে বিক্রি হয়। ঢাকার ব্যবসায়ীরা এসে অর্ডার দিয়ে গয়না বানিয়ে নেন। ছবি: মাহমুদ জামান অভি










স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পারিবারিকভাবে তারা গয়না তৈরি করে যাচ্ছেন ১৫০ বছর ধরে। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

Thursday, January 30, 2020

কৃষি যন্ত্রপাতিতে বিপ্লব দেশীয় বাজার চাহিদা ১০ হাজার কোটি টাকা

রুহুল আমিন রাসেল

কৃষি যন্ত্রপাতিতে বিপ্লব
কেবল ফসল উৎপাদনেই নয়, কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ প্রযুক্তিতেও বিপ্লব করেছে বাংলাদেশ। এখন প্রতি বছর কৃষকের চাহিদা ১০ হাজার কোটি টাকার মেশিনারিজ। আছে রপ্তানি সম্ভাবনাও। তবে সরকারি সহায়তায় ঘাটতি দেখছেন উদ্যোক্তারা। তারা বলেছেন, চড়াসুদে ব্যাংক ঋণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন। জানা গেছে, কৃষি আধুনিকায়নের ফলে কম খরচেও উৎপাদন বেশি হচ্ছে। বাড়ছে আয়। দেশে এখন ৯০ শতাংশ কৃষি জমি তৈরির কাজ করছে ট্রাক্টর। ফলে ফসলের উৎপাদনও ১২ থেকে ৩৪ শতাংশ বেড়ে গেছে। বপন যন্ত্র ব্যবহারের ফলে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বীজ ও সার সাশ্রয় হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত কৃষি যন্ত্রপাতির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। স্থানীয়ভাবে তৈরি এসব কৃষি যন্ত্রপাতির চাহিদার বৃদ্ধির ফলে গড়ে ওঠেছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কৃষি যন্ত্র তৈরির কারখানা। দেশে কৃষি যন্ত্রাংশের উৎপাদন শুরু হয় আশির দশকে। ঢাকার জিনজিরা, ধোলাইখাল, টিপু সুলতান রোড, নারায়ণগঞ্জের ডেমরায় বিপুল পরিমাণে কৃষি যন্ত্র উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে বগুড়া, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রচুর পরিমাণে মানসম্মত যন্ত্রাংশ তৈরি হচ্ছে। তবে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ক্ষেত্রে বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও প্রয়োজনীয় সরকারি উদ্যোগ ও অবকাঠামো না থাকায় এই খাতের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ এগ্রিকালচার মেশিনারিজ মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি খন্দকার মনিউর রহমান জুয়েল বলেন, দেশীয় বাজারে প্রতি বছর ১০ হাজার কোটি টাকার কৃষি মেশিনারিজের চাহিদা রয়েছে। তবে কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরি ও রপ্তানিতে প্রচুর সম্ভাবনা থাকলেও, সরকারি সহায়তা নেই। তারপরও দেশে উন্নত মানের কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরি হচ্ছে। এমনকি চীনের চেয়েও উন্নত মানের মেশিনারিজ তৈরি করছে বাংলাদেশ। কিন্তু ক্রেতারা এখনো বিদেশি মেশিনের দিকে ঝুঁকছেন। বাংলাদেশ এগ্রো-প্রসেসর অ্যাসোসিয়েশন-বাপা’র শিল্প পরিদর্শন কমিটির চেয়ারম্যান ইশাকুল হোসেন সুইট বলেন, দেশে ধান উৎপাদন সাড়ে তিনগুণ বেড়েছে শুধু কৃষি আধুনিকায়নের ফলে। তবে কৃষির আরও আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিগত সরকারি সহায়তা প্রত্যাশা অনুযায়ী কম। এর সঙ্গে ব্যাংক ঋণের উচ্চসুদ ও উদ্যোক্তাদের ঋণ না পাওয়াটাও বড় চ্যালেঞ্জ। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের খামার যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের পরিচালক মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, দেশের কৃষি উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়েছে আধুনিক যন্ত্রাংশ ব্যবহারের জন্য। কৃষক ও উদ্যোক্তাদের সচেতন করতে আমরা বিভিন্ন এলাকায় মেলার আয়োজন করেছি। এই খাতে ভর্তুকির ফলে কৃষি উৎপাদনের চিত্র বদলে গেছে। এখন আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, রাজস্ব খাত থেকে সরাসরি কৃষকদের ভর্তুকি দেওয়া হবে যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ওপর। প্রকল্পটি খুব দ্রুত শুরু হবে। দেশের কৃষিকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর করা গেলে উৎপাদন ৩/৪ গুণ বাড়ানো সম্ভব। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের প্রফেসর ড. এ টি এম জিয়াউদ্দিন মতে, কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ফলে ফসলের উৎপাদন খরচ কমে যাওয়ার পাশাপাশি ফসলের নিবিড়তা ৫-২২ ভাগ বেড়ে যায়। এ ছাড়াও বীজ বপন যন্ত্রে বীজ বুনলে বীজ ২০ ভাগ সাশ্রয়ের পাশাপাশি সার ১৫-২০ সাশ্রয় হয়। অন্যদিকে ফসলের উৎপাদনও ১২-৩৪ ভাগ বৃদ্ধির সঙ্গে কৃষকের আয় বাড়ে ২৯-৪৯ ভাগ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের খামার যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের তথ্যমতে, কৃষি খাতে আধুনিক মেশিনারিজ প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর সরকার ৭০ ভাগ পর্যন্ত ভর্তুকি দিচ্ছে। দেশের কৃষি অর্থনীতিতে বিপ্লব এনে দিয়েছে সরকারের এই উদ্যোগ। গত কয়েক বছর ধরে কৃষি শ্রমিকের সংকট কমাতে ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। জমি চাষ থেকে ফসল মাড়াই-সব প্রক্রিয়ায় যুক্ত হচ্ছে আধুনিক কৃষি মেশিনারিজ প্রযুক্তি। জাপানের প্রযুক্তি নিয়ে এসেছে দেশীয় একাধিক বিপণন প্রতিষ্ঠান। দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষক ও উদ্যোক্তাদের কাছে নিয়ে গেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। ২০১০ সালে প্রথম কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প হয়। তখন আধুনিক যন্ত্রাংশ ব্যবহারের ওপর ২৫ শতাংশ হারে ভর্তুকি দেওয়া হয়। সর্বশেষ ২০১৭ সালে দক্ষিণ এলাকা ও হাওর অঞ্চলে ৭০ শতাংশ ও অন্যান্য এলাকায় ৬০ ভাগ হারে ভর্তুকি দিচ্ছে। সরকারের এই প্রকল্পের কারণে ভাগ্য বদলে গেছে হাজার হাজার কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তার। বর্তমানে এই খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে রিপার মেশিন, কম্বাইন্ড হারভেস্টার, ট্রেইলার, রোটারি ট্রেইলার, লন মোয়ার, আয়রন হুইল, ডাবল পিলো, ফ্লিপ পিলো, স্পিডারসহ নতুন সব প্রযুক্তি মেশিনারিজ। ডাল গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক প্রকৌশলী মো. শোয়েব হাসান বলেন, ভর্তুকি মূল্যে কৃষকদের মাঝে কৃষি যন্ত্রপাতি বিতরণের সুফল মিলেছে। এখন প্রয়োজন কৃষকদের প্রশিক্ষণ, উদ্বুদ্ধকরণ ও কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার বাড়ানো। সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষি যান্ত্রিকীকরণে চাষের পর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় বীজ বপন, গুটি ইউরিয়া সার প্রয়োগ, শস্য কর্তন, শস্য মাড়াই, শস্য ঝাড়াইসহ অন্যান্য কার্যাবলিতে কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার। ফলে কৃষক দিন দিন কৃষিযন্ত্রের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে। একটা ফসল লাগানোর মধ্যবর্তী সময় কমে যাওয়ায় কৃষকরা বছরে এখন দুটি ফসলের স্থানে তিনটি ফসল করতে পারছে।
 বাংলাদেশ প্রতদিন।