ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা এখন দেশের ফুলের দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে
পরিচিতি লাভ করতে যাচ্ছে। ফুলের রাজধানীখ্যাত যশোরের গদখালীর পরেই স্থান
করে নিয়েছে কালীগঞ্জ। যশোর ও ঝিনাইদহ থেকে সারাদেশে যায় হরেক রকমের ফুল।
দেশে ফুলের অর্ধেক চাহিদা পূরণ হয় এই দুুটি জেলা থেকে আসা ফুলে। এবারের
বিশ্ব ভালবাসা দিবস, পহেলা ফাল্গুন ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ঝিনাইদহের
কালীগঞ্জের ফুলচাষিরা দেড় থেকে দুই কোটি টাকার ফুল বিক্রির টার্গেট
নিয়েছেন। বর্তমানে তারা ক্ষেতের ফুলের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।
ঝিনাইদহ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর
জেলার ৬ উপজেলায় ২শ ৮ হেক্টর জমিতে বিদেশী ফুল লিলিয়াম, জারবেরা,
চন্দ্রমল্লিকা, গোলাপ, থাইগোলাপ, গ্লাডিওলাসসহ বিভিন্ন রকমের ফুলের আবাদ
হয়েছে। এর মধ্যে শুধু কালীগঞ্জ উপজেলার ফুলের আবাদ হয়েছে ১শ হেক্টর জমিতে।
কালীগঞ্জে চাষ হওয়া ফুলের মধ্যে রয়েছে লিলিয়াম, জারবেরা, গ্লাডিওলাস,
রজনীগন্ধা, গোলাপ, চন্দ্রমল্লিকা, ভুট্টাফুল, গাঁদাফুল, থাই গোলাপসহ
বিভিন্ন রকমের ফুল।
ঝিনাইদহ জেলার সবচেয়ে বড় ফুলচাষী কালীগঞ্জ উপজেলার ত্রিলোচনপুর
গ্রামের এস এম টিপু সুলতান জানান, দক্ষিণাঞ্চলের হন্ডিতে টাকা লগ্নি করে
যখন এ অঞ্চলের মানুষ দেউলিয়া হয়ে পড়ে সে সময় থেকেই তিনি ফুল চাষের সঙ্গে
যুক্ত হন। তিনি প্রথম ফুল চাষ শুরু করেন বলে দাবি করেন।
তিনি শেরে বাংলানগর ফুলচাষী ও ফুল ব্যবসায়ী সমিতি লিমিটেডের
সহ-সভাপতি। ঢাকায় তার ফুলের ব্যবসাও রয়েছে। তিনি কালীগঞ্জ উপজেলার
ত্রিলোচনপুরের মাঠে মোট ১৫ বিঘা জমিতে ফুলের আবাদ করেছেন। এর মধ্যে ২ বিঘা
জমিতে গোলাপ, ৬ বিঘায় জারবেরা, ২ বিঘায় গ্লাডিওলাস, ৩ বিঘায় ভুট্টা ফুল ও ২
বিঘাতে চন্দ্রমল্লিকা ফুল রয়েছে। পাশাপাশি তিনি ২ বিঘা জমিতে পেয়ারা, ২
বিঘা ৫ কাঠা জমিতে ড্রাগনফল ও ৩ কাঠা জমিতে স্ট্রবেরি চাষ করেছেন বলে জানান
তিনি।
টিপু সুলতান আরও জানান, তিনি ২৭ বছর ধরে ফুলের সঙ্গে জড়িত। সর্বপ্রথম
গ্লাডিওলাস দিয়ে ফুলের চাষ শুরু করেন। এরপর জারবেরা ফুলের আবাদ করেন।
সর্বশেষ ২০১৭ সালে লিলিয়ামের চাষ করেন। নেদারল্যান্ডস থেকে ৬০ হাজার পিস
লিলিয়াম ফুলের বীজ আনেন। গত দুই বছর ধরে তিনি লিলিয়াম ফুল বিক্রি করছেন।
তার ফুলের পরিচর্যায় রয়েছে ৪ জন স্থায়ী কর্মী। এছাড়া প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫
জন ব্যক্তি পরিচর্যার জন্য কাজ করেন। স্থায়ী ৪ জনকে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা
বেতন দেওয়া হয়। অন্যদের দৈনিক জনপ্রতি ২শ টাকা করে মজুরি দেন। ফুলের
পরিচর্যা, সেচ, সার, ওষুধ, পরিবহনসহ তার প্রতিবছরে ব্যয় হয় ২৪ থেকে ২৫ লাখ
টাকা। বছরে তিনি অর্ধ কোটি টাকার ফুল বিক্রি করেন বলেও জানান। ব্যয় বাদে
বছরে তার লাভ থাকে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা।
এ ব্যবসায়ী আরও জানান, ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত ফুলের ব্যবসা ভাল
হয়। এ সময় ফুলের দাম ভাল পাওয়া যায়। তিনি পাইকারী হারে ১টি লিলিয়াম ফুল ১০০
টাকা, জারবেরা ১২ থেকে ১৮ টাকা, গ্লাডিওলাস ১২ থেকে ১৯ টাকা, গোলাপ ৫ থেকে
১০ টাকা, চন্দ্রমল্লিকা ১ থেকে ৩ টাকা, ভুট্টা ফুল ৩ থেকে ৭ টাকা করে
বিক্রি করে থাকেন। অবশ্য বাজার ভাল হলে দাম বেশি পাওয়া যায়। সে সময় প্রতিটি
ফুলের দামও বৃদ্ধি পায়। আসছে বিশ্ব ভালবাসা দিবস, পহেলা ফাল্গুন ও
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে তিনি ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার ফুল বিক্রি করতে
পারবেন।
তার দাবি, চলতি বছরে ঝিনাইদহ জেলা থেকে ওই তিনটি দিবসে দুই থেকে আড়াই
কোটি টাকার ফুল বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আরও জানান, চীন থেকে
প্লাস্টিকের ফুল আমদানি বন্ধ হলে ফুলচাষিরা আরও বেশি লাভাবান হবেন।
একই এলাকার জিল্লুর রহমান, নয়ন মিয়াসহ কয়েকজন ফুলচাষি জানান, তারাও এই
তিনটি দিবসে কয়েক লাখ টাকার ফুল বিক্রি করতে পারবেন। যশোর রাজার হাট এলাকা
থেকে ফুলের চাষ করতে আসা মাহাবুর হোসেন জানান, তিনি দীর্ঘদিন প্রবাসে
ছিলেন। সেখান থেকে এসে ৩ বিঘা জমিতে জারবেরা চাষ করেছেন।
কালীগঞ্জ উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের ডুমুরতলা গ্রামের ফুলচাষি
মিজানুর রহমান জানান, তিনি গাঁদা ফুলের চাষ করেন। চলতি বছর তিনি ৫ কাঠা,
একই এলাকার মোহাম্মদ আলী ও এমদাদুল হক দুই ভাই ৮ কাঠা, আব্দুল আলীম ৫ কাঠা
জমিতে ফুলের আবাদ করেছেন।
তিনি আরও জানান, দড়িতে ফুল গেঁথে ঝোপা তৈরি করা হয়। এক ঝোপায় সাড়ে ৬শ
থেকে ৭শ গাঁদা ফুল থাকে। ফুলের মূল্য কম থাকলে এক ঝোপা বিক্রি হয় ৩০
টাকায়। দাম বাড়লে সর্বোচ্চ ৭শ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। বর্তমান ৩শ ৫০ থেকে
৪শ ৫০ টাকা দরে প্রতি ঝোপা ফুল বিক্রি হচ্ছে।
ঝিনাইদহ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃপাংশু শেখর
বিশ্বাস জানান, জেলার চলতি বছর প্রায় ২শ ৮ হেক্টর জমিতে ফুলের আবাদ হয়েছে।
উৎপাদন ব্যয় কম, আবার লাভ বেশি হওয়ায় কৃষকরা ফুল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। জেলার
গান্না ও কালীগঞ্জের বালিয়াডাঙ্গা, তিল্লা, সিমলা, রোকনপুর, গোবরডাঙ্গা,
পাতবিলা, পাইকপাড়া, তেলকূপ, গুটিয়ানী, কামালহাট, বিনোদপুর, দৌলতপুর,
রাড়িপাড়া, মঙ্গলপৈতা, মনোহরপুর, ষাটবাড়িয়া, বেথুলী, রাখালগাছি, রঘুনাথপুর
কোলাবাজারসহ জেলার বিভিন্ন গ্রামের মাঠে ফুল চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে
সবচেয়ে বেশি গাঁদা ফুল চাষ হয় কালীগঞ্জে বালিয়াডাঙ্গা এলাকায়। এ কারণে সবাই
এখন এই এলাকাকে ফুলনগরী বলেই চেনে।
সরেজমিনে বালিয়াডাঙ্গা বাজার ও কালীগঞ্জের মেইন বাসস্ট্যান্ডে দেখা
যায়, দুপুর থেকে কৃষকেরা ক্ষেতের উৎপাদিত ফুল ভ্যান, স্কুটার ও ইঞ্জিনচালিত
বিভিন্ন পরিবহন যোগে নিয়ে আসছেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বালিয়াডাঙ্গা
বাজার ও কালীগঞ্জ মেইন বাসস্ট্যান্ড ভরে যায় লাল, সাদা আর হলুদ ফুলে।
সারাদেশের আড়তগুলোতে ফুল পাঠাতে আসা একাধিক ফুলচাষির সঙ্গে আলাপ করে জানা
গেছে, সারা বছরই তারা ফুল বিক্রি করে থাকেন। তবে প্রতিবছর বাংলা ও ইংরেজি
নববর্ষ, স্বাধীনতা দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ভালবাসা দিবস, পহেলা
ফাল্গুনসহ বিভিন্ন দিনগুলোতে ফুলের অতিরিক্ত চাহিদা থাকে। এ সময় দামও থাকে
ভালো।
ফুলচাষিরা সারা বছর তাদের ক্ষেতের ফুল চুক্তি মোতাবেক ঢাকা,
চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বড় বড় শহরের ফুলের আড়তে পাঠিয়ে দেন। এ সব স্থানের
আড়তদারেরা বিক্রির পর তাদের কমিশন রেখে বাকি টাকা পাঠিয়ে দেন। ফলে ফুল
চাষিদের টাকা খরচ করে ফুল বিক্রির জন্য কোথাও যেতে হয় না। তারা মোবাইল বা
ফোনালাপের মাধ্যমে বাজার দর ঠিকঠাক করে ফুল পাঠিয়ে থাকেন বলেও জানান
কৃষকরা।
এদিকে ফুলের আবাদকে কেন্দ্র করে কালীগঞ্জ উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা বাজারে
গড়ে উঠেছে ফুলের জন্য আলাদা বাজার। ফুলচাষিরা সরাসরি এ বাজারে ফুল বিক্রি
করতে আসেন। ফুলচাষিদের কাছ থেকে সরাসরি ফুল ক্রয় করেন এ বাজারের শুকুর আলী,
ইউসুফ আলী, প্রদীপ বাবু, শামীম, ফজলুর রহমানসহ একাধিক ফুল ব্যবসায়ী।
বালিয়াডাঙ্গা গোপীনাথপুর গ্রামের ফুল ব্যবসায়ী শুকুর আলী জানান, তিনি
ফুলচাষিদের কাছ থেকে সরাসরি গাঁদা ফুল ক্রয় করেন। বর্তমানে এক ঝোপা হলুদ
গাঁদা ফুল ৩শ ৫০ থেকে ৪শ ৫০ টাকা ও এক ঝোপা লাল গাঁদা ফুল ৫শ টাকা দরে ক্রয়
করছেন।
তিনি জানান, কালীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার আবাদ করা ফুল যাচ্ছে ঢাকা,
চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, খুলনা, বরিশাল, সিরাজগঞ্জ,
সৈয়দপুর, রংপুর, নওগাঁ, ফরিদপুর, কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।
কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ জাহিদুল করিম বলেন, ঝিনাইদহ
জেলার মধ্যে কালীগঞ্জ উপজেলাতেই ফুলচাষ সবচেয়ে বেশি। চলতি বছর কালীগঞ্জ
উপজেলাতে ১শ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের ফুল চাষ হচ্ছে। এ ফুল চাষের সঙ্গে
প্রায় ৭শ থেকে ৮শ ফুলচাষি জড়িত। এখানে বিদেশি ফুল লিলিয়াম, জারবেরা,
গ্লাডিওলাসসহ গোলাপ, গাঁদা, রজনীগন্ধা, ভুট্টাফুলের চাষ হচ্ছে। আমরা কৃষি
বিভাগ থেকে ফুলচাষিদের সার্বিকভাবে সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়ে আসছি।
বিডি প্রতিদিন/আল আমীন
No comments:
Post a Comment